Next Page

Translate

ছোটগল্প বিভাগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প বিভাগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১ মে, ২০২৩

Bengali-Short-Story-"Sankraman"

ছোটগল্প_সংক্রমন

প্রবীর তা

মধ্য বসন্তের মধ্য প্রহর। মেঝেয় কাত্ হয়ে পড়ে প্রবাল। বালিশে কান লগ্ন। ঘোরের মধ্যেই শুনতে পায় শিখার শিৎকার ইস্...ইস...। লাগোয়া পাশের অন্ধকার ঘর হতে ভেসে আসে। যেন তার মস্তিষ্কের অবচেতনায় মৃদু খন্ড-সুরেলা শব্দবিক্ষেপ একটা কাঁপন তোলে। শির শিরিয়ে শিরদাঁড়ায়। আরও স্পষ্ট শুনতে পাওয়ার প্রয়াস পায়। কান দু'টো খাড়া হয়ে। খান্‌ কি তোর এই সিংহী কাঁকাল, একঝুড়ি পাছার উপর একতাল – অই পাঁচফুটের টিকটিকি –

Bengali-Short-Story-Saṅkramana

– ইস্...ইস্...চুপ্ শুনতে পাবে শিখার লম্বা নখের করতল চেপে বসে দীপুর জোড়া ওষ্ঠে। নিজের কানদুটোকে বিশ্বাস করতে পারে না প্রবাল। ছট্‌ফটানি শুরু হয়। অথচ উঠে যে যাবে...বন্ধ দরজায় ধাক্কা যে দেবে – ভাবতেই অসাড় শরীরটায় কাঁপন ওঠে। বহুক্ষণ...সে কাঁপন। মস্তিষ্কের শিরা হতে সারা শরীর বেয়ে থরথরিয়ে সে খেলা চলে। থিতিয়ে যায় একসময়। দু'চোখের কোল বেয়ে অশ্রু গড়ায়। না কি তরল আগুন ! তপ্ত লাভা স্রোত !

শিখার শারীরিক গোপন আবেদনের এইসব উদগ্র বিনিময়ের এক চেটিয়া অধিকারের শিলমোহরটা তো শুধু তারই নামের উপর। শিখা তার স্ত্রী। সাতপাকে বাঁধা। স্বজন-বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়ে বর্ধমান কোর্টে তাদের রেজিষ্ট্রি। সে তখন পঁচিশ। শিখা আঠারো। দেখতে দেখতে দেড়দশক পর সে এখন চল্লিশ। শিখা তেত্রিশ।

এইত ক'দিন আগের কথা। স্পষ্ট মনে পড়ে তার। শিখা ছিল চ্যালেঞ্জ। তার জীবন...যৌবনের। তাকে ছিনিয়ে নেওয়া। বন্ধুদের কাছে দু আঙুল V চিহ্নতুলে কোর্ট চত্বরে- ই কণ্ঠি-বদল। জয়ের মালা বিয়ের মালায় যুক্ত হয়ে কণ্ঠ বিনিময়। সদলবলে বাড়ি ফিরে রাত্রে ডিনার পার্টি।

তারপর উত্তেজনা-উপভোগের ক'টা দিন পার হতে গতানুগতিক সংসার জীবন। রাজনীতি- ব্যবসা-ঘাত-প্রতিঘাত উত্থান-পতনের অনিবার্য বহমানতা। কিন্তু তাই বলে এরকম একটা মুহুর্ত তার জীবনের সামনে হাজির হবে তা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে নি।

প্রবাল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তার বাবা শংকর সন্তানহীনা বিধবা মাসির সম্পত্তি পেয়ে যৌবনেই উঠে এসেছিল বিনপুরে। বিয়ে-থা করে বিনপুরেই স্থায়ী বাসিন্দা। আত্মীয়- স্বজন-জ্ঞাতি-গুষ্টি সবই আছে দূরে। শ্বশুর বাড়িটাও হল সেই সূত্রধরে। চলি-শ কি.মি দূরের জ্ঞাতি-গুষ্টির-ই সুবাদে।

সাতাশ বিঘে ধানজমি-বসতভিটে-গোয়ালবাড়ি পুকুর গড়ে খামার-বাড়ি অলংকারাদি সব পেয়েছিল প্রবালের বাবা। পুকুর বলে পুকুর। পাকা রাস্তার ধারে জল পাড় মিলে দশবিঘে। মধ্যবিত্ত স্বচ্ছল পরিবার। পাড়া-পড়শির ঈর্ষনীয় ব্যাপার। কেনই বা না হবে। পড়শিরা যেখানে সবে দশ-পনের বিঘের যৌথ-পরিবার।

তবু প্রকাশ্য ছিল না কিছুই। মোটের উপর শান্তি-সৌহাদ্য বজায় ছিল। আর তার অনেকটাই এই কারণে যে প্রবাল পার্টি করে। বাবার পথ ধরে বামপন্থী। পরোপকারী। কলেজের ছাত্র- ইউনিয়ন শেষ হলে গ্রামে। পঞ্চায়েতে। লোকালে। যুব ফেডারেশনে। মাদার পার্টির মেম্বারশিপৃ যদিও মেলে নি যথাযথ ক্রাইটেরিয়ার অভাবে; তবুও মাঝারি অংশের চাদা দিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, বাজারে চা-দোকানের বেঞ্চি থেকে পার্টি অফিসে আড্ডা মারা... পার্টির গায়েই লেগে থাকা সকাল-বিকেল। আর সেই সুবাদে মধ্যবিত্ত থেকে গরীব-গুর্বোদের সমীহ আদায় করাটা যেন হয়ে যায় সহজাত। বিশেষ করে যখন টানা আড়াই দশক ধরে সর্বত্র পার্টিতন্ত্রের অগ্নিযুগ। স্বর্ণরাজ্য প্রতিষ্ঠিত।

সেই সুবাদে বিয়েটাও করে ফেলা গোঁড়া দক্ষিণপন্থী পরিবারে। শিখা মাধ্যমিকের পর ভর্তি হলেও মন বসে নি পড়ায়। স্কুলে হল- করেই সবার নজর কাড়ে। কাচ মিঠে রঙ আর নজরকাড়া গড়নে সব বদমায়েসি থেকে রেহাই পায় অনায়াসে আর তেমনি চোখের তারা। আগুনের শিখার মতোই অশনি ঝিলিক চাহনি।

সুতরাং তার বয়ঃসন্ধিক্ষণের নিত্য-নতুন ধরা-ছাড়া প্রেমিকদের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জটা পেয়ে বসল প্রবালকে। আর নজর পড়ার সদ্য বছরের মধ্যেই সফল হল। অন্যেরা হাঁ করে দূর থেকে দেখল। শুনল আরও দূর হতে। তারপর যথারীতি সব মিলিয়ে গেল।

এদিকে ৭৭-র মে আসার পর বামফ্রন্ট শুরু করেছিল অপারেশন বর্গা। তার রেশ চলল দু'দশক ধরে। চতুর্থবার এসেই নিজেদের কিছু বেছে বুছে ধরার পালা শুরু হল। পার্টির ভিতরে কথা উঠছিল। স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রশ্ন সমালোচনার মুখে। বিশেষ ক'রে মিছিল মিটিং-এ যখন নব্বই শতাংশ উপস্থিতি ক্ষেতমজুরদের। এস.সি.এস.টি সংখ্যালঘুদের। অন্ধকারে আঙুল তুলে দেখাচ্ছিল ন’কুড়ো আর সাত কুড়ো বাকুরি দু'টো। প্রবালদের।

ষলোবিঘে ! ষলোবিঘেই কি না কে জানে ! প্রবালের বাবার মেসো কিনেছিল চাল-খুদ দিয়ে। দু'বেলা একটা আধময়লা কাপড় পড়ে। হাঁটুর উপরে। একবারেই তো আর হয়নি। পাশের দশকাঠা-একবিঘে কিনে কিনে কয়েক বছর লেগেছে। স্বপ্নের বাকুরি দু'টো গড়তে। না খেয়ে-না পরে কার জন্য কিনেছিল কে জানে ! প্রশ্নটা উঠেছিল বৈকি। মাঠে-ঘাঠে। যেদিন পায়েপায়ে দু'হাজার লোকের মিছিল উচ্চকিত -োগানে লাল পতাকা পুঁতেছিল বাকুরি দু'টোতে, ক'দিন পরই স্ট্রোক্ হল তার বাবার। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হল। বাড়ির উনুন নিভল। মা-বউ-বাপের বাড়ি চলে গেল। আর মরা আরশোলার মতো দলিল দস্তাবেজ নিয়ে প্রবাল ছুটল আর,আই থেকে বি.এল.ওর কাছে। তো পরেরদিন লোকাল পার্টি অফিস। চিরুনি তল-সি হল কতটা অংদং, জংদং।

তিন সপ্তাহ পর ফিরে এল বাবা। মা-বউও বাড়ি এল। দুরাগত আত্মীয়-স্বজনও এল একে একে। মা-র তরফে মামা। বাবার তরফে কাকা। বউ-র তরফে শ্বশুর-সম্বন্ধি।

পায়ের সুতো ছিঁড়ে, জুতোর শুকতলা খুঁইয়ে যন্ত্রণায় উনিদ্র রাত্রি শেষে জানা গেল - ষলো বিঘেই নয়। দু'টো বাকুরিতেই ঢুকে থাকা তিন একর ছাড়তে হল।

বাপ-বেটাকে বোঝাল সবাই। মামা-মাসি থেকে শ্বশুর-সম্বন্ধি। ছেড়ে দাও; বেশি বাড়াবাড়ি করে লাভ নেই। জীবনে বাঁচতে দেবে না। দেখছ না কি দিনকাল। মিত্তির-রা হাইকোর্টে জয় পেয়েও জমি ফেরৎ পায় নি। পার্টির নেতা বলেছে – এখন আমাদের পার্টির জোর, জমি আমাদের-ই; যখন তোমাদের জোর হবে দখল নেবে। ওসব কাগজপত্তর ধূপ-ধূনো দিয়ে আলমারিতে পুরে রাখা গা। তোমার তো একটাই। আঠারো বিঘে কম কি ! আবার দেখতে দেখতে হয়ে যাবে। ও একটা ব্যবসা-ট্যাবসা করুক। আর জমি কিনে দরকার নেই। ব্যাঙ্কে দু'তিনটে এ্যাকাউন্টে রাখো।

হ্যাঁ বাঁধি-ই করুক তোমার মতো। রিক্ কম। বড়মামা বোঝাল। শ্বশুরও সায় দিল। আর পার্টি করে দরকার নেই। দেখলে তো কেমন স্যাঁক !

-প্রবাল নিঃশব্দ। কেমন যেন সিসিয়াস-সিরিয়াস ভাব লক্ষ্য করে মাসি বলল – কি রে আজ দু'দিন ধরে তুই একটা রা-বোল্ কাড়ছিস্ না। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে আছিস। ঝাঁকুনি দিল। নিঃশব্দে প্রবাল তবু পাল্টা ঝাপটা দিয়ে উঠে গেল।

তার বাবার ও বাজারে যাওয়া বন্ধ হল। সিঁটিয়ে গেল গোয়ালবাড়ি আর খামারের মধ্যে। প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে পার্টি করার সাধ ঘুচল। মাঝে মাঝে ডাকাবুকো চেহারার নিজস্ব নিয়োগে নিরাপত্তা-রক্ষার প্রয়োজনও ফুরল।

দীপু এসেছিল। সন্ধ্যের পর। সেদিন-ই প্রথম। পার্টির সহকর্মী। এর আগে পর্যন্ত আড্ডাটা সীমাবদ্ধ ছিল চায়ের বেঞ্চি থেকে পার্টি অফিসে।

দীপুর পার্টিতে আসা বেশিদিনের নয়। মাত্র বছর চার-পাঁচ। সখের বামপন্থী। ধনীর দুলাল। বাপ দু'দুটো রাইস মিল, আধখানা কোল্ড স্টরেজের মালিক। এছাড়াও কূল দেব-দেবী নামে- বেনামে দু'শ বিঘের উপর ধানজমি, পুকুর বাগান, গ্রাম থেকে শহরে বেশ ক'টা দোতলা- তিনতলা পাকা বাড়ি। পেট্রোল পাম্পও করেছিল। কাগজপত্রের গোলমালের কারণে তা বন্ধ আছে। বাজারেও রয়েছে দু'তিনটে বাড়ি। ব্যাঙ্ক থেকে পোষ্ট অফিস সব ভাড়ায় বসানো। আর এইসব ফুলে ফেঁপে ওঠা কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ সবই এই আড়াই দশকের মধ্যে। দক্ষিণপন্থী পরিবার। বাবা আর দুই দাদা মিলে সব দেখাশোনা করে। ছোট দীপুটাকে ছেড়ে রাখা হয়েছে। পোশাকি ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজনে। দমকা ঝড় ঝাপটা সামলানোর জন্যে। সেটা যেমন পরিবারটা জানে তেমনি পার্টিও। আবার দীপু নিজেও। তাই দীপুর পার্টিতে আসায় পরিবারটার যেমন ভারসাম্য রক্ষা হয়েছে, তেমনি পার্টিরও। আর তাই দীপুর উপর কোন চাপ নেই। না বাড়িতে – না পার্টিতে। আরও একটা সত্যি হল এটাই যে, দীপু যে কাজটা করতে পারে অনায়াসে, পার্টির অনেক হোমড়া-চোমড়া নেতাও তা বহুকষ্টে পারে না। কেননা, তাদের চাষ-বাস-শিল্প-বাণিজ্যে কম করে দু'হাজার পরিবারের অন্ন যোগায় তারা। সেটা সব পার্টির-ই জানা।

দীপু ফর্সা। দোহারা-সুঠাম চেহারা। এমনিতে বোঝার উপায় নেই। পেটে মদ পরলেই ভয়ংকর। রাত নটা সাড়ে ন'টার পর। মজলিস-মেহফিলে ঝলসে ওঠা সে আগুন নেভাতে তখন হিমশিম খেতে হয় সঙ্গীদের। রাস্তার ধারেই তাদের বিঘে দশের বাগান বাড়ি। মোজায়েক তিনতলার ঘরে বসে মেহফিল। বাজার থেকে কিছুটা দূরে। মাঝে মাঝে সে আসরে বসেছে প্রবাল। নিয়মিত সদস্য সংখ্যা তিন-চার জন। প্রবালের মতো অনিয়মিতের সংখ্যা কত কে জানে।

সেই দীপু-ই এসেছে সবশুনে। প্রবালকে ক'দিন বেরুতে না দেখে। দীপু পার্টি সদস্য নয় ঠিকই, অথচ বাজারে পার্টির দোতলা লোকাল কমিটির শেষকথা যেন সে-ই। কথাটা অনেকবার মনে হয়েছে প্রবালের। মনেই হয়েছে শুধু। বলেনি কাউকে। দীপু তার চেয়ে বছর তিন-চারের ছোট-ই হবে। নাম ধ'রেও ডাকে না। দাদাও বলে না। কাছাকাছি থাকলে সম্বোধনের শব্দটা শুধু ‘এই’। তাতেই সব কাজ মিটে যায়। প্রবালও তাতেই খুশি। না হলেও কিছু করার নেই। ধনীর পুত্র। মিশছে-মিশতে পারছে সেটাই গর্বের।

প্রবালের খাটে বসে দীপু। শিখা চা নিয়ে আসে। দৃষ্টির চকিত বিনিময়েই শিউরে ওঠে দীপু। কোঁকরানো ঘনকালো চুল। চোখের তারায় অশনি ঝিলিক। নিঃমেষে তার হৃদপিন্ডে একটা মৃদু কাঁপন তুলে অলক্ষ্যে-ই মিলিয়েই যায় ভিতরে।

- ‘শোন-দীপুদা’ শেষ শব্দটা কানে যেতেই খট্‌কা লাগে প্রবালের। অবনত চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়। চোখ তোলে। এবং চকিতে নির্লিপ্তের ভান করে তাকায় শিখার পানে।

-প্রবালেরও ডাকনাম দীপু। সবাই জানে। দীপুর মুখে শিখার কল্যাণে এই প্রথম নতুন সম্বোধন কি না কে জানে।

প্রবাল বলে - কি বিস্কুট নেই ?

ফুরিয়েছে ক'দিন-ই। বলতে পারি নি। শিখা বলে থেমে থেমে।

আরে থাক্ থাক্। তুমি তো জানো - চায়ে বিস্কুট আমি পছন্দ করি না।

প্রবালের ভিতর আরও বিস্ময় উঁকি দেয়। তুই থেকে তুমি। পরক্ষণেই ভাবে - অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়তো তার এই দু'দিনে সহানুভূতির ছোঁয়া। কিন্তু অকস্মাৎ এই প্রাপ্তিও যে শিখার কল্যাণেই নয়, কে জানে।

শিখা পিছু হলে আরেক পলক চোরা দৃষ্টি হানে দীপু। আরেক বার চমকায় তার ভিতর। হৃদস্পন্দনের বেগ বাড়ে। তারপর অনেক কিছু শোনায়। অনেক কিছু বোঝায়।

এ সময় তোমার পার্টি ছাড়া ঠিক হবে না। আর বেরুনোটাও বন্ধ করা। যেমন করছিলে, তেমনই করো। বরং আরও বেশি করে। কাউকে বুঝতে দেবে কেন ? ব্যবসা ফাঁদো। টাকার কথা চিন্তা করতে হবে না। ন’কুড়োর মাথায় একটা ইলেকট্রিক স্যালো বসাও। ও ন’বিধে কেন, পঞ্চাশ বিঘের আয় ঘরে ঢুকবে। অত ঘাবড়ানোর কি আছে।

প্রবাল দীপুর কথাগুলো মনোযোগ দিয়েই শোনে। ভালোই লাগে তার। একটু সচকিত হয়ে ওঠে। নীরবতা ভাঙে। অই ন’কুড়োটা থেকে-ই তো চারবিঘে কেটে নিয়েছে।

সে আমি যতীনদাকে বলছি তোমার চিন্তা নেই। ‘ও' চার বিঘের বদলে তুমি অন্যত্র চার বিঘে দেখিয়ে দাও। আর কাজগপত্র সব পাকা করে নাও। (যতীন দাস লোকাল কমিটির সেক্রেটারি)।

- অ-নে-ক টাকার ব্যাপার।

- বল-ম তো সে চিন্তা তোমায় করতে হবে না। আরে ইউকো-টা তো আমাদেরই মাথার উপর।

কোন অভিজ্ঞতা নেই, আবার ঋণের জালে জড়াব !

-ধ্যুত...তুমি না ! কি বলব। পুরুষ মানুষের অত ভয় খেলে চলে। একটু এ্যম্বিসিয়াস হও নো রিক্স্ নো গেম। এই আমার বাবাকেই দেখ না। কত লোন আছে জানো ? শুনলে তোমার হার্টফেল হয়ে যাবে।

তোমাদের বিরাট ব্যাপার-স্যাপার।

আরে ছোট থেকেই বড় হয়। আর তুমি কি গলা ভর্তি নেবে না কি ? সে হবে। আগে তুমি একটু চাঙ্গা হও তো। অত সুন্দর বৌদি তোমার একটা ফুটফুটে ছেলে...তাদের কথাও তো ভাবতে হবে না কি।

এরপর দীপু চলে যায়। যাবার সময় আরেকপলক কটাক্ষ বিনিময় হয় শিখার সঙ্গে। বাইরে বারান্দায় দরজার পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে কথপোকথনের অনেকটাই শুনেছে সে। বৌদি আসলাম, দাদাকে বোঝান – ভাঙলে চলবে না - সংক্ষিপ্ত শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ করে যায়। আবার আসবেন। প্রত্যুত্তরে জানায় শিখা।

দু'দিন পরই আবার এক সন্ধ্যায় এসে প্রবালকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় দীপু। বাগান বাড়ির মেহফিলে। শিখা বৌদিকে কথা দেয় – দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যেই গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে যাবে। কতটা আর দূর বড়জোড় দেড় কি.মি ।

ভরপুর মদ মাংস খাওয়া শেষ হলে যথারীতি দীপুর ড্রাইভার পৌঁছেও দিয়ে যায় প্রবালকে। সাড়ে দশটার আগেই। শিখার মন্দলাগে না দীপুকে। যদিও অনেক আগেই স্বামীর মুখে তার অনেক গল্প শুনেছিল সে। রাত্রে বিছানায় সে স্বামীকে পরামর্শ দেয়; বড়লোকের ছেলে তো তাই উদার মনস্ক। করোই না ফার্মটা পুকুরের পাড়ে। অসুবিধের কি আছে। দীপু ঠাকুরপো তো বলছে সঙ্গে আছে।

প্রবাল ভাবে...নিঃশব্দে। অনেককিছু। নিজেকে ছাড়িয়ে ভাবনাগুলো পাড়ি জমায় বহুদূরে। ৭৭-য় বামফ্রন্ট আসার পর ১ম দশক। তার চোখের সামনে জ্বল...জ্বল করে ওঠে। খেটে খাওয়া মানুষের মিছিল। লাল পতাকার পত্...পত্...শব্দ। উচ্চকিত স্লোগান। ই-নৃ-কি- লা-ব জি-ন্দা-বা-দ। দুনিয়ার মজদুর এক হও। ইত্যাদি। তখনো গ্রাম-গঞ্জে উচ্চবিত্ত দূর অস্ত্র হাতে গোনা দু-একটা মধ্যবিত্তকে দেখা যেত পা মেলাতে সে মিছিলে। মিছিলের পুরভাগেও থাকত খেটে খাওয়া জনমজুররাই। স্লোগান যথাসম্ভব এড়িয়ে ঘাড় হেঁট করেই হাঁটত তাদের মতো দু-চারটে মধ্যবিত্ত।

তারপর দেখতে দেখতে আরও পাঁচটা বছর অতিক্রান্ত হল। সি.পি.এম. তথা বামফ্রন্ট শাখা বিস্তার করল সর্বত্র। প্রত্যেক বাড়ির হাঁড়ির ভিতর ঢুকল। দীপুদের মতো উচ্চবিত্তরাও লালিত পালিত হয়ে পা মেলাতে শুরু করল।

গা গতরে খাটা দৈনিক পঞ্চাশ টাকার মজুর থেকে পাঁচহাজার টাকার – এক সারিতে। দশবছর আগেও যাদের'কে বলা হত জোতদার....প্রতিক্রিয়াশীল সেইসব দেড়-দু'শ জমির যৌথ পরিবার...তিনপুরুষেই ভেঙেচুড়ে দশবিঘেও পেল না। অথচ মাসিক বিশ ত্রিশ হাজার বেতনের কর্মচারী বিশগুণ মধ্যবিত্ত হয়ে জন্ম নিল সর্বত্র। অথচ শুধুমাত্র অন্য মেরু হওয়ার কারণেই পুরনো মধ্যবিত্তরা তিন-প্রজন্ম ধরে বঞ্চিত হল।

পার্টির দৈনিক মুখপত্র থেকে ইশতেহার মার্ক্স-লেলিনের কোড্ করা তর্জমাগুলো তার প্রায় মুখস্ত। পার্টির গোপন আদর্শ ও লক্ষ্য নাকি মধ্যবিত্তটাকে বিরাট সর্বহারা শ্রেণিতে পরিণত করা।

বিশ্বায়নের নতুন প্রেক্ষিতে আপাতঃ ভারসাম্য রক্ষা করা।

নিজের দিকে তাকায় প্রবাল। তারই বা এত কন্ঠ কেন ? আদর্শটাকে সে কি গ্রহণ করেছিল? এখন মনে হয় প্রশ্নটা তা নয়। সে গ্রহণ করুক বা না করুক বেছে বেছে সেই কেন শিকার হল? তারচেয়ে অনেক বেশি-বেশিরা তো রয়েছে আশে পাশেই।

চুপি-চুপি কথাটা শুনিয়েছিল দীপুই তাকে। ওসব তত্ত্ব-তত্ত্ব ছাড় তো। চুড়ান্ত মাত্রায় একটা ভারসাম্য রক্ষাকারী দল। যতটা পারা যায় টুপি পরিয়ে লুঠে পুঠে খাওয়া আর কি। অভিযোগ না উঠলেই হলো। কথাটা পুরো মাত্রায় সত্যি। চারিদিকের বাস্তবতায় এর বাইরে কিছু মনে হয়নি তারও। দীপুদের মতো লোকেরা বছরে পঞ্চাশ হাজার চাঁদা দেয় পার্টি ফান্ডে। ভোটের সময় লক্ষাধিক। আর তাই তার দশগুণ তোলে ঘরে। সাধারণের মাথা থেকে। অলক্ষ্য জাল বিস্তার করে। সেই বিদ্যেটারই অন্ততঃ খানিকটা শেখাতে চেয়েছিল প্রবালকে। শিখার টনে ! সত্যিই কি তাই ?

আর চাইলেও প্রবালের কি সেই পারঙ্গমতা আছে !

দীপুর কথামতো ন’কুড়োটা অক্ষুন্ন থেকেছে। পরিবর্তে অন্যত্র চারবিঘে দিয়ে। ভবিষ্যতের ভাবনাটা আর ভাববারও অবকাশ পায় নি প্রবাল। দীপুকে আরও পাশে পেতেই তার নতুন গতি শুরু হয়েছে।

ন’কুড়োর মাথায় ইলেকট্রিক সাবমার্শিবল; পরের বছরই পুকুরটার দু'বিঘে পাড় জুড়ে পোল্ট্রি ফার্ম। ব্যাঙ্ক থেকে দুলাখ। দীপুও দিয়েছে একলাখ। সাড়ম্বড়ে শুরু হল নতুন অভিমুখ । পিছনে ফেরার অবকাশহীন...শুধুই এগিয়ে চলা। এবং দীপুর বাগান বাড়ির আসরে নিয়মিত- র তালিকায় ঢুকে পড়া। প্রায় প্রতিদিন বিদেশি মদ। প্রবালের ফার্মের চারা মুরগি।

বছর ঘুরতেই শিখার শিখা আরও চমকে। আরও উঁচু হল। ড্রেসিং টেবিলে হেলেন কার্টিজ...ল্যামে সম্ভার। সুবাসিত করে রাখা দিনমান...রাত্রিভর। দু'বেলা কাজের মেয়ের নিয়োগ হল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাছ মুরগি দু'বেলার পাতে পড়তে লাগল। হাড়-হাভাতে কমরেড় গুলোর শুকুনির চোখ পড়ল আবার। নুনের ছিটে দিয়েও এড়াল না পড়শি ঘাটে বাঁকা হাসির চাপা গুঞ্জন। এ্যাটো বাসনে লেগে থাকা তেল-মশলার অস্থি টুকরো হাঁ করে দেখতে লাগল দুবেলা বিস্ফারিত চোখে।

পরের বছর পার হতেই ব্যাঙ্কের গাড়ি আসতে লাগল ঘনঘন। এত ধান বেচেও সুদ সব মেটে না। আসল তো দূরে থাক্। দীপু না হয় সুদ নেয় না। মেহফিলে মুরগি দিয়েই মিটে যায়। চারিদিকে শুরু হল ধরপাকড়। পোল্ট্রি ফার্মের মুরগি সব পুড়িয়ে দেওয়া শুরু হল। বার্ড- ফ্লু-র আতঙ্ক। ছোট-বড় দেড় হাজার মুরগি তার ফার্মে। সেই পরিমাণ মজুত তার খাদ্য সামগ্রী।

বিশেষজ্ঞের টিম্ এসেছিল। নমুনা নিয়ে গেছে। বলেছে আবার আসব। দৈনিক কাগজগুলোতেও প্রায়শঃ-ই খবর ছাপছে। আতঙ্কে শিখাও।

দীপু তখনো আশ্বস্ত করে। ভয় কি; আমি তো আছি না কি !

ভোররাত্রে চিৎকার উঠল – আগুন...আগুন। নিঃশব্দ ঘুমন্ত রাত্রির অন্ধকার বুক চিরে। অনেকেই বেড়িয়ে এসে দেখল - আগুনের লেলিহান শিখা...কালো ধোয়ার কুন্ডলী কেটে কেটে উপর পানে উঠছে। গ্রামের প্রান্তে উত্তরের পুকুর পাড়ে। চামড়া পোড়ার বিকট গন্ধও

ভেসে আসতে লাগল। নাকে কাপড় দিয়ে... ওয়াক......শব্দ তুলেও পড়শিরা বিস্ময়ে তাকায়।

হায়...হায় করে।

প্রবালের দুই প্রহরী ততক্ষণে ছুটে এসে হাঁফতে হাঁফাতে দুঃসংবাদটা জানায়। দীপুদার ফার্মে আগুন।

ছুটে গিয়ে দেখা যায় ততক্ষণে সব ভস্মীভূত।

নেভানোর আর প্রয়োজন হয়নি। আপনা থেকেই নিতে এসেছে। দেখেশুনে প্রবাল বোবা। মুখ দিয়ে টু-শব্দটিও বেরোয় না। কয়ারি করা দূরে থাক্।

সকালে পুলিশ এসেছিল। লোক দেখানি একটা ডায়েরি করে নিয়ে গেছে শুধু। কখন জ্বলেছে ? কিভাবে লাগল ? খবর এল শেষ রাতে ! এতসব প্রশ্ন অন্ধকার রাতের খোলা আকাশের শূন্যতায় পাক্ খেল...ক`দিন। তারপর যা-কে-তাই। রোজকার স্বাভাবিক জীবন।

প্রবাল আবার ঘরে ঢুকল। এবার আর দীপু এল না একবারও। সপ্তাহ খানেক পর ডেকে পাঠাল প্রবালকে। সন্ধ্যের পরই। বাগান বাড়িতে। আসরে। তবে মদ নয়। মদ রইল পাশের ঘরে। দীপুর ডাকাবুকো দুই সঙ্গী (না কি দেহরক্ষী) দু'পাশে।

প্রবাল মাথা হেট করে বসে। ভাবে দীপু তো আগাগোড়া তার পাশেই আছে। নিশ্চয়ই নতুন কিছু পরামর্শ দেবে। এ-সাত-দিনে সে দুমড়ে মুচড়ে গেছে।

দাঁড়িয়ে থাকা দীপুর উঁচু চোখ জোড়া তার আপাদ-মস্তক একপলক বুলিয়ে নেয়। ঘরের ইষদ লালাভ মিষ্টি আলোয় তাকে ছাড়ানো ঝল্সানো মুরগির মতোই মনে হয় দীপুর। দীপু নিঃশব্দে চেয়ারটায় বসে। পাশের সঙ্গী মুখ খোলে। এবার দীপুর টাকাটা তো শোধ করতে হবে, অ-নে-ক-দি-ন হল ।

প্রবাল যেন আছড়ে পড়ে আকাশ থেকে। এমনি বিস্ময় তার চোখে মুখে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না ক'রে সঙ্গীটা বলে চলে – নগদ্ টাকার এমনিতে বাজারে চলছে দশ পার্সেন্ট মাসে। তোর ক্ষেত্রে পাঁচ পারসেন্ট-ই। তিনবছর পার হল। হিসেব করে দ্যাখ্ – এক লাখ আশি। সুদে আসলে দুই-আশি। প্রবালের মাথা ঘুরতে থাকে। টলতে থাকে। মনে হয় বুঝি তক্তপোশটা ঘুরছে...গোটা ঘরটার সাথে। সে বসে থাকতে পারে না। ঝটিতি মাথা ঘুরে মুখ থুবড়ে পড়ে মেঝেয়।

সে বছর ধানও হল না। সব পোকায় কাটল। বিঘে দশবারোয় কাস্তে পর্যন্ত গেল না। বাকি ক'বিঘেয় পাঁচ-ছ মন হারে। অর্ধেক খরচও উঠল না। সম্বৎসর সংসার চালানোর কি হবে !

পৌষেই দ্বিতীয় স্ট্রোক হল বাবার। হাসপাতাল থেকে ফিরল শবদেহ। এ-অবস্থায় আবার বাবার কাজ। সুদে-আসলে দেনার পরিমাণ পাচ লাখের উপর। কাদার সময় পেল না সে। বিঘে দশ-বারো বেচলে তবে যদি শোধ হয়। নইলে আরও বাড়বে। সর্বস্ব হারানোর কিনারায় দাড়িয়ে আকুল হয়ে ভাবে প্রবাল।

শ্বশুর-সম্বন্ধি দেখেশুনে আড়ালে নাক সিঁটকালো। শিখার দিকে তাকিয়ে অবশেষে বাবার কাজটা থেকে উদ্ধার করল তাকে। ছোট করে হলেও ত্রিশ হাজার। তারপর ঝুড়ি ঝুড়ি উপদেশ দিয়ে চলে গেল সব।

পাঁচফুট তিন ইঞ্চির প্রবাল হল ঝড়ো কাক্। দীপুর বাগানের বিলিতি ছেড়ে স্যালোর ঘরে নিয়মিত হল চোলাই। সঙ্গে কাজের লোক সুবল বাউড়ি।

খবরাখবর নখদর্পণে রেখে দীপু ডাকল আবার। বাগানে। সম্ভ্রস্ত প্রবাল এল।

বাবার কাজের দিন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এসেছিল দীপু। নিজে কিচ্ছু খাব না বলে-ও শিখা ছাড়েনি। ঘরের খাঠে বসিয়ে নিজের হাতে দু'টো বড় রসগোল-- মুখে পুরে দিয়েছিল। তারপর হাতদুটো ধরে ফালা ফালা চোখে ফালা ফালা করে দিয়েছিল তাকে।

এবার দীপু নিজেই মুখ খুলল। পাশের সঙ্গীরা নিঃশ্চুপ। শুনতে পেলাম তুমি স্যালোর ঘরে বসে চোলাই ধ'রেছ।

প্রবাল নিরুত্তর।

এভাবে নিজেকে ল্যাংটো করছ ? এই মদ নিয়ে আয়।

অমনি পাশের ঘর থেকে বিলিতি এল। প্রবাল আপত্তি করলেও টিকল না। তিনঘন্টা ধরে

চলল মেহফিল। প্রবালকে ঘনঘন অন্যমনস্ক দেখে আবার মুখ খুলল।

- আমি কি বলেছি তোমায় – এখনি শোধ করতে হবে ? দরকার হলে আরও বিশ-পঞ্চাশ

নাও; অত ভেঙে পড়লে চলবে ? প্রবালের দৃষ্টিতে করুণ আর্তি। আকাশ-পাতাল ভাবে। নেশা হয় না এত মদেও। চারিদিকে যেন সব শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরে।

দীপুর কথায় যেন সে-শূন্যতার খানিকটা লোপ হয়। আবার আগের মতোই নিয়মিত হল বাগানের আসর।

দীপু জানে ন’কুড়োটার ভিতর চারবিঘের কাগজ ঠিক নেই প্রবালের। পাঁচবিঘের দাম বড় জোর তিন লাখ। সে অঙ্কে সে ইতি মধ্যেই পৌঁছে গেছে। স্যালোটার দরুন একলাখ। সুতরাং আরও পঞ্চাশ হাজার তাকে দিতে কোন অসুবিধা নেই। বড় মাছ তুলতে গেলে হুইলের শক্ত সূতো বেশি করে বুঝে-সুঝেই ছাড়তে হয়।

সঙ্গে শিখা। আগুনের মতোই...ধারাল কামল তার শরীর...যৌবন ।

এর মাস ছয়েক পরই। আষাঢ়ের প্রথম দিবসে এল সেই বহুকাঙ্খিত রাত। প্রবালের একমাত্র পুত্রকে নিয়ে তার মা গেছে বাপের বাড়ি। বাড়িতে শিখা একা। ঝম্...ঝম বৃষ্টি ঝরছে বিকেল হতেই। প্রবালকে ডেকে এনে খাওয়ানো হয়েছে বাগান বাড়িতে। ঘুমের বড়ির সাথে। রাত এগারটা।

পরিচিত গাড়ির আওয়াজটা দরজার কাছে এসেই বন্ধ হল। শিখার কানে যেতেই বারান্দার গেট খুলে উঠুনে নামল। বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পরক্ষণেই। ভিতর থেকে সারা নিতে দীপুর সঙ্গী বলল – বৌদি দরজা খোল।

শিখা খুলে দেখল প্রবাল নেই। দীপুর ড্রাইভার বলল – বৌদি শিগগির একবার চলো। শুনে আঁতকে উঠল শিখা। বিস্ময় তার চোখ মুখ ছাপিয়ে আছড়ে পড়ল উচ্চারণে – কেন ? কি ব্যাপার ? তোমার দাদা কোথায় ?

ওখানেই আছে, কিরকম করছে; তুমি একবার শিগগির চলো। প্রয়োজনে এই গাড়িতেই হাসপাতালে নিয়ে যাবো – এক্ষুনি।

—দীপু ঠাকুরপো ?

-ও-ই তো বলল যা ডেকে নিয়ে আয় বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে; যদি নিয়ে যেতে হয়।

-আর কোন প্রশ্নোত্তরের প্রয়োজন মনে করেনি শিখা। গেট ও দরজায় তালা দিয়ে গাড়িতে উঠেছে। সোজা গাড়ি এসে থেমেছে বাগান বাড়ির ভিতরে।

সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে গেল শিখা। নেশার ঘোরে তখন অচৈতন্য প্রবাল। ঘরের মেঝেয় কাত হয়ে পড়ে। চোখে মাথায় জলের ঝাপটা দেওয়া হয়েছে। বমিও করেছে বারান্দার বাথরুমে বারদুই। বুকের বোতাম খুলে কাত করে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে মেঝেয়। সিলিংফ্যান খুলে।

শিখা এলে দীপু বলে – বালিশটা মাথায় গুঁজে দিতে। এখন আর ডিসটার্ব করে লাভ নেই; ঘুমোচ্ছে ঘুমুক। অসুবিধে বুঝলেই নিয়ে যাবে। এখন তো ভালোই রয়েছে। তুমি বরং এখানেই থাকো রাতটা। আর বাড়ির চাবিটা দাও। ওদের একজন গিয়ে বারান্দাটা খুলে শুগ্। শেষরাতের দিকে বুঝলে বাড়ি দিয়ে আসবে।

শিখা চোখের তারায় দৃষ্টি হেনেও দীপুর চাহনি দেখতে পায়নি। একান্ত অনুগত আর বিশ্বাসেই কাপড়ের খুঁট হতে চাবির রিং তুলে দিয়েছে দীপুর হাতে।

তারপর মধ্যরাতেই শিখাকে টেনে নিয়ে গেছে দীপু পাশের ঘরের খাঠে। আর শেষরাতে বিদায় দেবার আগে সংক্ষেপে শুনিয়েছে তিনলাখ পাওয়ার কথাটা। যাতে শিখা আপাততঃ এই বিনিময়টা অক্ষুন্ন রাখে। তার কথা মতো...ইচ্ছানুযায়ী।

বর্ষা পেড়িয়ে বসন্ত। ফিরে ফিরে এসেছে এই রাত প্রায়শঃই। দীপুর বাগান বাড়িতে। সপরিবার মেহফিলের মধ্য দিয়ে। আর ঘোরের মধ্যেই প্রবাল সেদিন প্রথম শুনল শিখার শিৎকার...ইস্...ইস্ ধ্বনি।

তারপরও ন’কুড়োটা রক্ষা করতে পারেনি প্রবাল। দীপুর সর্বগ্রাসী মুষ্ঠি থেকে। এমনকি পুকুরের অর্ধেকটা বেচে ব্যাঙ্ক ঋণটা শোধ হয়েছে। আর অবশেষে বলে কয়ে বাপের বাড়ির সুপারিশে শিখা অঙ্গণ ওয়াড়ির কাজটা পেয়েছে। আর প্রবাল হয়েছে বিরোধী দলের সক্রিয় সদস্য।

-বিগত দু'দুটো ভোটে বিরোধী দলের পালে হাওয়া উত্তাল হয়েছে। প্রবাল খেটেছে দিনরাত। সব যন্ত্রণা বুকে চেপে সে আজ পরিবর্তনের দিন গোণে। মিছিলে পা মিলিয়ে সেও বলে বদলা নয়, বদল চাই। কিন্তু সে কি জানে বিরোধী দলটারও সদস্যহীন হয়ে অলক্ষ্য শেষ কথা দীপু-ই !

বোকা প্রবাল। হতভাগ্য প্রবাল। বেচারা প্রবাল ! সেকথা জানে না বোধহয়। কেননা দীপুর বাবা-দাদা বিরোধী দলের তহবিলেও বিশহাজার দেয়। সরকারে এলেই সেটা লক্ষাধিক হবে।

-আর তাই সে  স্লোগানটার ভিতরে আরেকটা স্স্নোগান নিজের মতো করে তৈরি করে নেয় ‘বদলা চাই...তাই বদল চাই'।

মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২০

Short-Story-Raktapayi । Sharadiya-Sankha । 2015 । Thrilling-Bengali-short-story

ছোটগল্প_রক্তপায়ী

রক্তপায়ী

ধ্রূবপালি শুদ্ধতা


(এক)


   মৃত্যুভয়টা ইদানিং তাড়া করে বেড়াচ্ছিল দিলদারকে। রাতে বিছানায় ঘুমনাশা। বিশেষ করে মধ্যরাতের পর। যখন দুরন্ত বাইক গুলোর বিকট কর্কশ টানা আওয়াজ গুলো ঘুমন্ত রাতের স্তব্ধতাকে চিরে ফালা ফালা করে তার সদর দিয়ে চলে যায়। গাঁয়ের ভিতর দিয়ে। একে বেঁকে...। তখনি সে তড়াক করে বিছানায় লাফিয়ে বসে। খালি গায়ে। ঘামতে থাকে কলকলিয়ে। শুরু হয়ে যায় বুকের ভিতর ধকধকানি খেলাটা। ছোট করে কাটা মাথার চুলগুলো  ঘামে ভিজে গিয়েও ঠারো হয়ে ওঠে।
যদি ওরা দরজা ভাঙে কিংবা টপকে বাড়ি ঢোকে ! সে কি সামনে মুখো-মুখি দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ একসেপ্ট করবে...!
অসম্ভব ! কি নেই ওদের হাতে। ভোঁজালি, বর্শা, ক্রিচ, ধারালো-ছুঁরি, পিস্তল সব। আর সংখ্যায় চল্লিশ পঞ্চাশ জন কম করে। প্রত্যেক বাইকে দু তিন জন..। এই সব মারাত্মক মারণাস্ত্র হাতে নিয়ে রাত ভর গ্রাম গুলো টহল মেরে যাচ্ছে।

Pencil-Drawing
তার চেয়ে বরং সে মাটির ঘরের অন্ধকার পাটাতনে নিঃশব্দে গা ঢাকা দেবে। আর সেখানেও যদি বিপত্তি ঘটে তো খড়ের চাল ফুঁড়ে লাফিয়ে পড়ে অন্ধকারের কোন কোন গলি ঘুঁজি দিয়ে পালিয়ে বাঁচবে তার একটা রূপরেখা খোঁজা চলতে থাকে মগজের ভিতরে।
যদিও তেমন কিছু ঘটে না। ঘন্টাদুয়েক পর আবার আওয়াজ গুলো ফিরে এলেও শেষ পর্যন্ত মিলিয়েই যায় রাত শেষের অন্ধকারে। শেষ রাতটুকুতে গ্রামটা ফিরে আসে নিজের জায়গায়।
চৌত্রিশ দিলদার স্বভাবতই দিশেহারা। কদিন ধরে। গত দশবছর সে পার্টিটা করে আসছে। নাওয়া খাওয়া একরকম শিকেয় তুলে। শুরুটা হয়েছিল সেই চব্বিশ বছর বয়সে। ২০০৮-এ। এমনি পঞ্চায়েত নির্বাচনের মাস কয়েক আগে। বাবার-ই  সহকর্মী গনু সিংহের হাত ধরে এসেছিল প্রথম। গঞ্জের ময়দানে। বিরোধী দলের সমাবেশে। শহর থেকে আসা একঝাঁক নেতা বসেছির মঞ্চের উপর। আগুন খেকো বক্তিতা শুনে সে যাই বুঝুক.. গনু বুঝিয়েছিল শেষে এই পার্টিটাই আসছে।
দলের ভিতরকার কতা। উপর তলার। বলা কওয়া শুনেছি। বলে দিলুম মিলিয়ে নিস।
গনু তখন শাসকদলেই ছিল। শেষটায় আর তেমন সুবিধে হচ্ছিল না। কড়াকড়ি..। উপর তলার চাপ। শুদ্ধিকরণ.. ড্যমেজ কন্ট্রোল এ সব কি না লেগেই ছিল। সাসপেন্ড করে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল... ছোট বড় কমরেডদের। তলায় তলায়..। তবে আর কি করতে পড়ে থাকা। আবর্জনা স্তুপের মতো। অপমান গালিগালাজ সব মুখ বুজে সয়ে। অঞ্চল সেক্রেটারি হয়েও বেড়িয়ে এসেছিল সেদিন। সাঙ্গ-পাঙ্গদের নিয়ে। তাদের অর্নত্তম ছিল দিলদারের বাপটাও। তৌহিক।
বাপের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিল দিলদারও। গনুর ছায়া সঙ্গী হয়ে। ক্রমে পার্টি কর্মী হয়ে ওঠে।
অঞ্চলের এমন কোনো পার্টি পোগ্রাম নেই, যেখানে দিলদার নেই। তাছাড়া রাজ্যস্তরের মিটিং মিছিলেও গনুর সাথে পা মেলানোয় ব্যাতিক্রম ছিল না তার। এমনকি গনু ছাড়াও। গাঁ ভিন গাঁয়ের সমর্থক অসমর্থকদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বসে থেকে সঙ্গে করে স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ভারা করা বাসে তুলে শহরের সমাবেশে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথেই  পালন করে এসেছে।
পাড়ায় উঠতি কয়েকটা চ্যাংড়া চেলাও তৈরি করে নিয়েছে। ডাইনে-বাঁয়ে। রাত বিরেতে অনেক সময় বাইকে ফিরতে হয়। সাবির, নুর, জলুরা তখন সঙ্গেই থাকে এগু পিছু করে।
সাবির বলে পঞ্চায়েত ভোটটা দুম করে চলে এল। না কি বল দিলু ভাই।
বুঝচিস না ক্যানে, আমাদের দলটা সরকারে আছে, তাল বুঝেই তড়িঘড়ি করে নিতে চাইচে।
এবার কিন্তু তোমায় দাঁড়াতেই হবে। সদস্যটা না হলে কদ্দিন আর হ্যাংলামো করবে ? যাই বলো সইয়ের দাম আলাদা।
টিকিট দেবে ? এ অঞ্চলটা দেবু মাস্টারের।
দেবে না মানে ?
গনু ভাই তো শত্রূদল থেকে এয়েচে না, তাই জোর খাটাতে পারে না।
ক্যানে একেই তো অঞ্চল সভাপতি করেচে।
তা করেচে, ওর পকেট গুলোও তো পেতে হবে।
দেবু মাস্টার কে ধরো.., যদি না দেয় তো চলো বড়ফুলে।
লুফে নেবে।
রাজুদা দেখা হলেই বলে।
কি ?
দিলুটাকে নিয়ে আয় ; সমিতির আসন পাক্কা।
চোখ দুটো বড় বড় করে তাকায় দিলদার বলচিস ?
দিল দার মুখে একথা বললেও পরিস্থিতি বুঝে ভিতরে ভিতরে সেও একপা তুলে নিয়েছে.., রাজুর সঙ্গে তারও ফোনে কথা হয়েছে.., সেটা তখনো টের পায়নি অনুগামীরা।
এখন তাদের মুখে সে কথা শুনে খানিকটা আশ্বস্ত হয়।



(দুই)


    রাত্রি বারোটা। নোয়াপাড়া কবর স্থানের পাশে বেল তলায় একে একে জড়ো হয় বাইকগুলো। প্রত্যেকটা বাইকে দু তিন জন করে আরোহী। কয়েকজনের কাঁধে ঝুলি। জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম এই নোয়াপাড়া। নটা পাড়া নিয়ে সম্পূর্ণ মমুসলিম অধ্যুষিত বড় গ্রাম। তারি পাশাপাশি আরও দু-তিনটি পাতলা বসতি। উপগ্রাম। হোদলা-আহিরি-টুঁটিচাপা। হোদলায় সবই গোয়ালা। কায়স্থ পরিবার। আহিরি ও টুঁটিচাপায় অন্যান্য উপজাতির বাস। পাকা সড়কের দুধারে। শোনা যায় একটা সময় ছিল যখন ঠেঙারে দস্যুদের মুক্তাঞ্চল ছিল এই এলাকা। চওড়া পাকা সড়ক চলে গেছে ব্লক শহর থেকে জেলা শহরে। তাকেই কেন্দ্র করে বড় বড় গ্রাম গুলির মোড়ে গজিয়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার। গ্রামের ভিতর থেকে উঠে এসেছে অনেক উঠতি পরিবার।  রাস্তার ধার বরাবর। দ্বিতল ত্রিতল পাকা বাড়ি। দোকান বসতি। তারই সাথে সরকারি ভবন। স্কুল, পঞ্চায়েত, সমবায় ব্যাঙ্ক, পোষ্ট অফিস ইত্যাদি। কাজেই পুরনো বিন্যাস গেছে পালটে। উন্নয়নের ধাক্কায়। এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। নোয়াপাড়া গ্রামপঞ্চায়েত অন্ত্রর্ভুক্ত আঠারো কুড়িটি গ্রাম। সতেরটি বুথ। ঘুমের চাদরে যখম চাপা পড়ে যায় রাতের অন্ধকারে.. তখন জেগে ওঠে এই চল্লিশ পঞ্চাশ জন যুবক। যারা স্বঘোষিত ভার নিয়েছে অঞ্চল দেখভালের। তলোয়ার, পিস্তল, বোম-বারুদ ইত্যাদি সব ভয়ঙ্কর মারনাস্ত্র নিয়ে যারা রাত ভর অঞ্চলটায় টহল দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছে।
প্রায় সব গ্রাম থেকেই নূন্যতম একটা বাইক ও দুজন করে আরোহী এসে জমা হয়।  মিনিট পনেরর মধ্যেই। এই দুজনই শেষ পর্যন্ত সেই গ্রমের শেষ কথা। ভালো মন্দের ভাগ্যবিধাতা। অদৃশ্য.. অলিখিত। কেননা পরিবার গুলোর খুঁটিনাটি সমস্ত তথ্য তাদের নখদর্পনে। কি খায়, কোথায় যায়, কি কি বলে.. কোনো কিছুই তাদের অজানা থাকে না।
বাইরের অঞ্চল থেকে আসে দু-চার জন। বাইক থেকে নেমে দলটা বৃত্তাকারে জড়ো হয় বেলতলায়। নীচু স্বরে বিনিময় হয় কিছুক্ষন। প্রতিদিনকার মতো ফিরোজ আজও একটা রুটম্যাপ শোনায় সকলকে। নোয়াপাড়া গ্রামের ভিতর দিয়েই চার কি.মি. লাল মোরামেররাস্তা চলে গেছে পশ্চিমে। পাশের কুলটি গ্রামে ঢুকে যুক্ত হয়েছে অন্য একটি স্টেশন গামী পাকা সড়কে। কুলটিতে ঢোকবার মুখেই দিলদারের বাড়ি।
দলটির নেতৃত্বে দলের অঞ্চলিক সভাপতি ফিরোজ। ফিরোজ সমিতির সহ সভাপতি দেবু মাস্টারের কাছের লোক। অনুগামী। তাই অঞ্চল সভাপতি গনু সিংহকে সে পাত্তাই দেয় না। কেননা মাদার পার্টির অঞ্চল সভাপতির পদটা তারই প্রাপ্য মনে করে ফিরোজ। দেবু মাস্টার প্রবোধ দেয়- নির্বাচনটা পার কর দেখছি।
দিলদারের হাবভাব ভলো না সে খবর ছিল ফিরোজের কাছে। সন্দেহের তারিকায় সে উঠে এসেছিল তলায় তলায়। তার সে মতি গতির খবর কমাস অগেই সে পৌঁছে দিয়েছিল উপর তলায়। দেবু মাস্টারের কাছে। দেবু মাস্টার বলেছিল- ওয়াচে রাখ। দলের অলিখিত নিয়ম এই- চান্স না পেলে সাইড লাইনের ধারে রিজার্ভ বেঞ্চেও বসে থাকবে তবু বিরোধী দলে নাম লিখিয়ে খেলা চলবে না- সেটা কি জানিস না ?
তাই দিলদার ওয়াচেই ছিল এতদিন- ওয়েট এন্ড ওয়াচ নীতি মেনে।
হঠাৎই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকার ভোটের দিনক্ষণ ঘোষনা করে দিল।
আগামী কালই মনোনয়ন পেশের শেষ দিন।
ইতিমধ্যেই সপ্তাহ খানেক ধরে এ অঞ্চলে বিরোধী দলের যে কটা মনোনয়ন জমা পড়েছে- সবই ফিরোজের হাতে গোনা। সে হিসেব করে বলে দেয়- পাঁচটা। সমিতির একটা নিয়ে। তার ছায়া সঙ্গী কালু বলে ভাই শেষ দিনে বাকি গুলো জমা দেবে।
সে তো দুঃস্বপ্ন, অই পাঁচটাকেই প্রত্যাহার করাবো তুই দেখে নে। আজ সে রকমই কাজ আচে। কেউ যেন এদিক ওদিক করবি না। আমি যেভাবে নির্দেশ দেব তার যেন এতটুকু নড়চড় না হয়।
ঠিক আচে, সশব্দে সমবেত উচ্চারণ করে সকলেই সম্মতি জানায়।
আর দিলুটার কি করবে গুরু- শেষ মুহূর্তে কালু শুধোয়।
এখনো তো নামটা লেখায় নি- লেখাক তার পর দেকচি।
কিন্তু ওই তো সাহস জুগিয়েছে বেনুদের।
চল... দেকচি।
বারোটা পনেরয় বাইক গুলো রওনা দেয়।



(তিন)


    শেষ পর্যন্ত সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছুঁড়ে ফেলে দিলদার। যখন দেখল দল বিশেষতঃ দেবু মাস্টারের দল বল তাকে কোনো টিকিটই দেবে না।
এই কয় দিন সে গনু সিংহের পিছু ছাড়েনি। সারাটা দিন দলীয় কার্যালয় থেকে ব্লক অফিস- গাঁ ভিন গাঁয়ের দলীয় আঞ্চলিক দলীয় কার্যালয় ঘুরে ঘুরে রাতে বাড়ি ফিরেছে।
গনু সিংহ তাকে জানিয়ে দিল কোনো আশাই তো দেখছি না রে। সতেরটা আসনে ইতিমধ্যেই কুড়িটা জমা পড়েছে। কাল আরও দুটো পড়বে। ফুলগাম ও রাইপুরের।
এম.এল.এ কে পাঁচটা দিয়ে বাকি বারোটা ওরা ভাগ করে নিয়েছে। চার জনে। সভাপতির স্বামী হায়াদার আলি আরও একটা চেয়েছিল, পায়নি।
তোমাকে ?
না, একটাও না। সমিতির সিটটা দিয়েছে শুধু। তাও হায়দার জোর করাতে।
দিলদার অমনি গনুকে জানিয়ে দেয়- তাহলে আমি ছাড়লুম।
গনুর অজনা ছিল না। তবু হাঁ করে বিস্ময়ে তাকায় একপলক। ভিতরে আটকে থাকা একখন্ড বাতাস হুম শব্দে বেড়িয়ে আসে। বলে ওরা কি তোকে টিকিট দেবে ?
হুঁ... সমিতির। কালই জমা দেব।
তাহলে বাড়িতে থাকিস না রাতে... কারণ শুধোস না।
দৃষ্টি বিস্ফারিত করে তাকায় দিলদার। বলে বুঝেছি।
পারলে ও-কটাকেও সরে যেতে বলিস -পুনরায় জানায় গনু।
মধ্যরাত পার হতেই কেঁপে কেঁপে ওঠে গোটা গ্রাম। বিস্ফোরণের ভয়ঙ্কর শব্দে। কাঁচের বাসনের মতো ভেঙে খান খান হয়ে যায় নিশুতি রাতের স্তব্ধতা। কোলের শিশু বিছানায় অকষ্মাৎ জেগে উঠেই কঁকিয়ে ওঠে আর্তস্বরে। ঘরবন্দি মানুষ গুলো আঁতকে ওঠে ঘুমের থেকে। বিছানা থেকে নেমে আলো জ্বালাতেও সাহসে কুলায় না। কেউ কেউ ত্রস্ত পদে কোন রকমে জানালার খোলা উপর পাট বন্ধ করে নিঃশব্দে মশারিতে ঢোকে।
এর পর অনাচে কানাচে যে টুকুও বা অবশিষ্ট থাকে নিমেষে সব গ্রাস করে সন্ত্রাস। ভেসে আসে আগুন... আগুন... বলে চাপা শব্দ। সঙ্গে বয়ে আনে পোড়া গন্ধ। বেনু গোপালের খামারেই পর পর বিস্ফোরণ গুলো ঘটানো হয়। বড় পালুইয়ে আগুন ধরে দাউ দাউ করে ঠারো জ্বলে যায়। সঙ্গে পাশেই থাকা জন মুনিশের চালা ঘরটাও। আর কদিন পরই বাইরে থেকে তাদের আসার কথা। বোরো ধানে পাক ধরেছে। গোলা জাত করতে। বেনু গোপাল বাড়ি ছিল না। থাকলে হয়তো বেরিয়ে আসত...। আর তখনি আরও দুটো একটা বোমার আঘাতে তার শরীরটাও ছত্রকার হতো।
    পরিস্থিতি অনুমান করেই সে সটকেছে। দিলদারদের সঙ্গে করে। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসাতেই দিলদার এসেছিল তার কাছে। চুপিসারে। গনু সিংহের সতর্ক বাণী শোনায়। তারপরই একপ্রস্থ আলোচনা হয়। অন্যান্যদের  ফোনে ডেকে এনে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই পরিকল্পনাটা তৈরি করে ফেলে তারা। পাশের জেলার হীরাপুরেই পালাবে তারা। জেলাস্তরের নেতা সহ সভাপতি রাজুদা কে ফোনে ধরে জানানো হয় সব কথা। দিলদারের অন্যান্য সাঙ্গ-পাঙ্গ দের খবরটা জানানো হয়।
রাজুর নির্দেশ মতোই রাত দশটার মধ্যেই হীরাপুর পার্টি অফিসে উপস্থিত হয় তারা। আর সেখানেই অরেক প্রস্থ আলোচনায় হীরাপুর ও নবগ্রামের কোন কোন পার্টি কর্মির বাড়িতে তারা রাত কাটাবে তা ঠিক হয়।
পরের দিন সকাল নটার মধ্যেই সকলকে জুটিয়ে এনে পার্টি অফিসে উপস্থিত হবার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সকাল হতেই বেনু গোপালরা বাড়ির ফোনে সব খবর শুনে জ্বলতে থাকে ভিতরে।




(চার)


    সকালে নোয়াপাড়া বাজারের চা বেঞ্চিতে নিচু স্বরে বিনিময় চলে।
পৌঢ় দিবাকর ঘোষ রিটায়ার্ড প্রাইমারি শিক্ষক। বলে- মন্টূ ভাই এসব কি হচ্ছে !
মোন্টূ মোল্লা সম্পন্ন চাষি। বলে সেই তো, এসব তো হবার কথা ছিল না। এসব হচ্ছিল বলেই তো বা সব পাল্টানো। একন তো দেকচি টকের জ্বালায় পালিয়ে এসে তেঁতুল তলায় বাস।
পাশেই ছিল সামু। ঠান্ডা চায়ে চুমুক দিয়ে বলে- তবু ভালো। ওদের অত্যচার সব ভূলে গেছ কি না। পুকুরে মাছ হতে দিয়েচে, গোলায় ধান তুলতে পেরেচো- এ্যাঁ...।
ওদের চোখে মুখে ছিল হিংসা.. নিঃশ্বাসে ছিল বিষ। কম রক্তপায়ী ছিল না কি ওরা।
সেই ওরাই তো এয়েছে ঘুরে। বকলমে। ওদের ছায়াই তো ঘিরে রয়েচে সব খানটায় দ্যাকো তাকিয়ে।
    সকাল সাড়ে নটার মধ্যেই হীরাপুর বাজারের পার্টি অফিসে একে একে জড়ো হয়ে যায় সব। তির-ধনুক তলোয়ার যে যেমন পারে সঙ্গে নিয়ে আসে। আশপাশের দশবারোটি গ্রামের সমর্থক থেকে পার্টি কর্মী। সমবেত দের ছোট বড় দুটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। সশস্ত্র মিছিল করে জনা পঞ্চাশের ছোট ভাগটা যাবে পাশের জেলার বি.ডি.ও অফিসে। দিলদার বেনু গোপালদের সঙ্গে করে। শেষ দিনে মনোনয়ন পেশ করতে।
আর বাকি দেড় দুশ নিজেদের হীরাপুর বি.ডি,ও. অফিসে। ওরা যতই ভয় দেখাক, আক্রমন করুক একটা অসনেও ওয়াক ওভার দেওয়া হবে না। উপর তলার কড়া নির্দেশ। পালটা আক্রমনের জন্য সবাই যেন তৈরী থাকে। জেলার নেতা দশ মিনিটের বক্তিতায় উজ্জীবিত করে দলটাকে।
    আঞ্চলিক মন্ডলের সভাপতি কিশোরকে বলে দিলদার-- ভাই আমাদের দিকে আর একটু বাড়িয়ে দিলে ভালো হত। তোমাদের এদিকটায় তো পরিস্থিতি তেমন না। আমাদের আঞ্চলটায় অবস্থা খুবই ভয়ঙ্কর.. কি বলব। একটু জোর পেতাম আর কি। আর আমি তো টার্গেট হয়ে গেছি। বেনুগোপাল সায় দেয় দিলদারকে। পরিস্থিতি সবখানটাতেই এক। এই ভালো তো নিমিষে ভয়ঙ্কর। তবু বলছ যখন দেকছি কি করা যায়। তোমাদের ওখানটাতে বিশ-পঞ্চাশ জুটবে না ?
বাড়ি বাড়ি গিয়ে রাতের অন্ধকারে শাসিয়ে আসছে যে। তারপরও বোম মারছে। রাস্তা ঘাট বাজারে একা এলেই পিটোচ্ছে। কাল রাতের খবর শুনলে তো। বাড়িতে থাকলে খুন হয়ে যেতুম।
    তালডাঙ্গা থেকে আসা কুড়ি-পঁচিশ জনের সশস্ত্র আদিবাসী দলটাকে যুক্ত করে দেয় কিশোর দিলদারদের সঙ্গে। যাদের গোটা পঞ্চাশ পরিবার চওড়া পাকা সড়কের দুধারে বিক্ষিপ্ত হয়ে কুঁড়ে ঘরে বাস করে। কিছু পরিবার পাশের জেলারও অন্ত্রভুক্ত। আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের স্পর্শ পেলেও তির-ধনুক-বল্লম-ভোঁজালি যাদের শিকার ও একই সঙ্গে আত্মরক্ষার ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র বিশেষ। যদিও আজ আর তেমন কাজে লাগে না।
    যাদের ভিতর দু জনকে পার্শ্ববর্তী দুজেলার দুই পঞ্চায়েতের সদস্য পদে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।  শিবু সরেন আর মুংলী মুরমু। মুংলী আর তার স্বামীকে রেখে বাকি দলটা চলে যায় ও দিকেই।



(পাঁচ)


    ভালকো পঞ্চায়েত সমিতির সাত আট কি.মি. দূরে মথুরাপুর বাজার। তারই উপকন্ঠে এই তেমাথার মোড়। রাস্তার দুধার বরাবর পাকা ঘরের বসতি। দক্ষিন-পশ্চিম কোনে হীরাপুর থেকে পাকা সড়কটা এসে এই তেমাথায় মিশেছে। সোজা উত্তরে ভালকো পঞ্চায়েত সমিতির বি.ডি.ও. অফিস। নোয়াপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েত যার অন্ত্রভূক্ত। বেলা দশটা। প্রায় শ-খানেক মানুষের মিছিলটা এগিয়ে আসতে দেখা যায়। অস্ত্রের সঙ্গেই থাকে ফেস্টূন ব্যানার। আর উচ্চারিত স্লোগান। দূর হটো... দূর হটো...। নিপাত যাক... নিপাত যাক...।
    চওড়া তেমাথায় উঠে মিছিলটা বাঁ দিকে বাঁক নিতেই বিস্ফোরণ...। পর পর...। একটা-দুটো-তিনটে-চারটে...। ভয়ঙ্কর শব্দ দানবের হুংকারে কেঁপে কেঁপে ওঠে গোটা বাজার। বাজার সংলগ্ন বসতির ভিতর দু-চারটে সদর হয়তো বা হাট করে খোলা ছিল.., সশব্দে খিল আাঁটাতে মালুম হয়। আমনি দোকানের ঝাঁপ পড়ে আরও শব্দে। স্টিলের গেট-গ্রিল-সাটার ফেলার শব্দ। ভিতর থেকেই। ঘর বন্দি হয়ে যায় গোটা বাজার। ফুটপাতের টোং-এ হালকা যারা আধবন্ধ রেখেই যে ধারে পারে চম্পট দেয়। যেন সূতোয় ঝোলা জীবন... নিস্পন্দ হতে কতক্ষণ।
    আগুন ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধ যখন কয়েক মুহূর্তের জন্য সব আত্মসাৎ করে নেয়... মিছিল ছত্রাকার হয়ে যায়। কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়ার ভিতর ঝাপসা ছায়ামূর্তি গুলো এলো মেলো যে যেদিকে পারে দৌড় দেয়। সকালের রৌদ্রজ্জ্বল মাখা বসতি... রাস্তা বাজার নিমেষে বধ্য ভূমিতে পরিণত হয়।
    মিছিলের অগ্রভাগে ছিল দিলদার। বড়ফুলের পতাকা হাতে। ছিটকে চলে আসে ডান দিকটায়। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা জোরালো শব্দ বন্ধনী কানে যায় তার।
অইতো দিলদার.. শালা বেইমানটা দে শেষ করে...
অমনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গর্জে ওঠে পিস্তল। সশব্দে...।
ছুঁচলো অগ্নিস্ফুলিঙ্গ গুলো দুরন্ত বেগে তার বুক পাঁজরের ভিতর ঢুকে ঝাঁঝরা করে দেয় নিমেষে। রক্তাক্ত দেহে সে লুটিয়ে পড়ে রাস্তার উপর।
    নিমেষে শুন শান গোটা বাজার চত্ত্বর। অকুস্থল থেকে বেশ খানিকটা দূরে জেগে থাকে অবিরাম শুধু কুকুরের চিৎকার। মুখগুলো আকাশ পানে তুলে লম্বাটানা আর্তস্বরে কার কাছে কোন বার্তা পাঠায়... এরাই জানে।
মানুষের আশে পাশে সারা জীবন থেকে তাদের অন্নে প্রতিপালিত হয়েও মানুষ গুলো বুঝি দুর্বোধ্য থেকে যায় সারাটা জীবন।
    সে সব শব্দ চিরে উজ্জল দিনের মধ্যভাগে শশ্মানের চেহারা নেওয়া জনবহুল বাজারের রাজপথে লাশ কুড়োতে আসে পুলিশ। হাতের সঙ্গে মুখেও কুলুপ আাঁটা।
    খানিক পরে রাস্তার কুকুর গুলো ফিরে আসে অকুস্থলে। কালো পিচের উপর পোষাক ছাপিয়ে পড়া দিলদারের বক্ষ নির্গত চাপ চাপ তাজা রক্ত...। জমাট বেঁধে আছে। মুনিব নামক মানুষের নোনতা রক্ত। স্বাদ গ্রহন করে তার। চেটে খায় গনতন্ত্র...। বহু বছরের বহু মানুষের রক্তাক্ত সংগ্রামের ফসল।
    বাজারের প্রান্তে ভাটি খানায় পেট ভর্তি গিলে ছামু মাতালটা পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। কয়েগ মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে থাকে। সে দৃশ্য পানে। কি ঘটে গেছে... বাকি পৃথিবীতে নিরন্তর কি ঘটে যাচ্ছে...। সে সবের কোনো খোঁজের প্রয়োজন পড়ে না তার। বিড়বিড় করে আপন মনে কি বলে সেই জানে। পাশেই পড়ে থাকা এক টুকরো পাথর খন্ড তুলে নেয় হাতে। কুকুর গুলোর দিকে ছুঁড়ে মারে। আর ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে বলে-- আচ্চা পিশাচ... রক্তপায়ী তোরা।



(ছয়)


    ঘরে ঘরে টি.ভি.-র পর্দায় শুরু হয় সম্প্রচার। সব কটা বংলা খবরের চ্যানেলেই। টি.ভি. সাংবাদিক ঘটনা স্থলের ছবি তুলে ধরে। কোটি কোটি দর্শকদের উদ্দেশ্যে। কে এই দিলদার ? রক্তাক্ত রাজপথে উবুড় হয়ে পড়ে মৃত্যু শয্যায়।
ঠায় ঠিকানা বহন করে সাংবাদিক যায় নোয়াপাড়া অঞ্চলে তার বাড়ি।
টি.ভি.-র দৌলতে সচিত্র খবর ততক্ষণে রাষ্ট্র হয়ে গেছে। দৃশ্য দেখে কেউ কেউ যেমন শিউরে উঠেছে, আবার অনেকে বলে এ আর এমন কি ! এটাই তে বাংলার রাজনৈতিক কালচার... অনেক দিন ধরে।
    দিলদারের বাবা তৌহিক সেই ৭৭ সালে এমনি রক্তাক্ত দিনে বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ছিল। তার পর বেরিয়ে আসে সেও এক দশক। আগাগোড়া রাজনীতিতে মোড়া তৌহিক সাংবাদিক দের প্রশ্নের উত্তরে জানায় ওতো এই পার্টিটা ছেড়ে দিয়েছিল। অই পার্টিটাই করত।
কত দিন ?
অনেক দিন।
সময়ের বিচারে গুরুত্ব আরোপ করার কোন প্রয়োজনীয়তা তার মনে হয়েছিল কে জানে। অথবা অপ্রকাশ্য ভিতরের সত্যিটা তো বাবা-মায়েরই জানার কথা।
    বিরোধী দলের রাজ্য সভাপতি জানায়-- দিলদার তাদের দলেরই সহকর্মী ছিল। গত তিন বছর ধরে। শাসক দলের গুন্ডারাই তাকে খুন করেছে।
    এ পর্যন্ত এক-রকম ঠিক ছিল। কিন্তু অন্য রকম অরেকটা ঠিক বেরিয়ে আসতে কয়েক ঘন্টা পার হল। যখন শাসক দলের জেলা সভাপতির পাশে বসে দিলদারের সেই বাবাই জানাল-- দিলু এই পার্টিটাই করত। দশ বছর ধরে। ভূল সংশোধন করতে জানায় তখন মাথার ঠিক ছিল না।
    খবর শুনে নোয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যলয়ে দিলদারের এক মাস্টার মশাই অমিয় বাবু তার স্ত্রীকে বলে- মাথার ঠিক না থাকাটাই স্বাভাবিক কিন্তু যা অস্বাভাবিক তা হল পৃথিবীর কোনো শোকের সঙ্গেই যার তুলনা চলে না... সেই পুত্র শোকও আজকের গনতন্ত্রে বিপন্নতার শিকার। অমিয় বাবুর একমাত্র ছেলেও পেশায় শিক্ষক। বলে বাবা জানোনা বুঝি আজকের গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় একটা লাসের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা বেআব্রূ, নির্লজ্জ গণতন্ত্রের লজ্জাভরণতো ওই লাসটাই। সেটা শেষ পর্যন্ত যাদের অধিকারে থাকে... তাদের হাতেই যে অসল গণতন্ত্রটা সুরক্ষিত থাকতে পারে...। এই বিশ্বাস জনগণের মনে গেঁথে দিতে পারলেই কাজ সারা। কাজেই এমন লাসের জোগান সব দলের কাছেই মহামূল্য।
মিছিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া বেনু গোপালরা বাড়ি ফেরেনি। কে কোথায় খোঁজ খবর নেওয়ার অবকাশ থাকে না। ফোনের সুইচ অফ। পরের দিন সন্ধ্যায় খবরটা শোনে বেনুগোপাল। বিশুসরেন সহ তাদের পাঁচ জন প্রার্থীই মনোনয়ন জমা দিয়েছে। তবে, তাদের দলে না, শাসক দলের হয়ে। এমনকি সাংবাদিকদের তারা বলেছে দিলদার বরাবর শাসক দলটাই করত।।